মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ

কাতারের এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত, এশিয়াজুড়ে গভীর জ্বালানি সংকট

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান এলএনজি রফতানিকারক দেশ কাতারের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এশিয়ার দেশগুলোয় জ্বালানি অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোয় জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো উন্নয়নশীল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। খবর রয়টার্স।

চলতি বছরের শুরুতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বিশ্ববাজারে এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে বেশ ইতিবাচক ছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, বিশ্বজুড়ে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ বাড়বে। কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রকল্পগুলো চালু হলে বার্ষিক উৎপাদন ৪৬ কোটি থেকে ৪৮ কোটি ৪০ লাখ টনে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সে হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করায় বিশ্বব্যাপী এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পাশাপাশি পরিবহন খরচও বেড়েছে বহু গুণ।

সবচেয়ে উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাতারের এলএনজি গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাবে কাতারের লিকুইফ্যাকশন বা গ্যাস তরলীকরণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ক্ষয়ক্ষতির কারণে কাতার আগামী তিন-পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টন এলএনজি উৎপাদন করতে পারবে না। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি ও রিস্টাড এনার্জির মতো বড় বড় গবেষণা সংস্থাগুলো এরই মধ্যে তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ পূর্বাভাস প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টন কমিয়ে দিয়েছে। এ বিপুল পরিমাণ সরবরাহ ঘাটতি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য অন্তত পাঁচ বছরের মোট আমদানির সমান।

এলএনজি সরবরাহ সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে গ্যাসের দামে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত এশিয়ায় এলএনজির দাম ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) গ্যাসের দাম ২৫ ডলার ৩০ সেন্ট ছাড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগের, কারণ সাধারণত এ অঞ্চলের দেশগুলো ১০ ডলারের নিচে দাম থাকলে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্যাস আমদানি করতে পারে। বর্তমানের এ উচ্চমূল্য ২০২৭ সাল পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার ব্যয় বহু গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ সংকটের প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। কাতার সাধারণত তার উৎপাদিত এলএনজির ৮০ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোয় রফতানি করে। কিন্তু এখন চড়া মূল্যের কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প জ্বালানির সন্ধানে নামতে বাধ্য হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে অনেক দেশ পুনরায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। পাকিস্তানে পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে জ্বালানি সাশ্রয় করতে সেখানে সপ্তাহে চারদিন কর্মদিবস ঘোষণা করা হয়েছে। সার ও টেক্সটাইল বা পোশাক শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় গ্যাসের সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতিকে ‘চাহিদা বিনাশ’ বা ‘ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় আকাশচুম্বী থাকলে অনেক দেশ স্থায়ীভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানির দিকে চলে যাবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রফতানিকারক দেশ, কিন্তু তারা কাতারের এ বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করতে পারছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ গ্যাস রফতানি কেন্দ্রগুলো আগে থেকেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট গ্রাহকদের কাছে দায়বদ্ধ। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বাড়তি গ্যাস সরবরাহ করার সুযোগ তাদের কাছে খুবই সীমিত।

অন্যদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলো উচ্চমূল্য দিয়ে গ্যাস কেনার সামর্থ্য রাখলেও তারা ভবিষ্যতের সরবরাহ নিয়ে চিন্তিত। চীন এরই মধ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বাড়িয়ে তাদের নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে এনেছে। তবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ একটি বড় ধরনের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।

আরও